অটিজম হচ্ছে বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার সময়কার গঠনগত জটিলতা (Developmental Disorder)যেখানে সমষ্টিগত কিছু সমস্যা সন্নিবেশিত থাকে যেমন পরিবারের সবার বা কারো সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠাতে না পারা (Communication disorder) , একই কাজ বার বার করা,(Repetitive Behaviour), আংগুল দিয়ে কোন কিছু দেখায় দিলে সেদিকে না তাকানো।
এটি বাচ্চার আড়াই অথবা তিন বছর বয়সের মধ্যেই দেখা দিবে। অটিজমের ধরন বিভিন্ন হওয়ার কারণে একে অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডারও বলে।অটিজম বাচ্চাদের মনে একটা নীল জগত থাকে, এরা এদের কল্পনামূলক নীল জগতে ঘুরে বেড়ায়, এজন্য প্রতি বছর ২’রা এপ্রিলে(বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস)সরকারী ভাবে বিভিন্ন ভবনে নীল আলো প্রজ্জলন করা হয়।

কী কী কারণ অটিজম হওয়ার পিছনেঃ
1 জিনগত ত্রুটিযুক্ত বিন্যাস
2 পরিবেশ দূষণ
3 মা যখন বাচ্চা সম্ভাবা তখন রুবেলার টিকা না দেয়া থাকলে,
4 মা’র বাচ্চা পেটে থাকার সময় যথেচ্ছ ঔষধ খাওয়া, এলকোহল পান, সিগারেট খাওয়া, বিষাক্ত কিছু খাওয়া, মা’র ইমিউনিটু দুর্বল থাকা, বাচ্চার ভেক্সিন দেওয়া (তবে এই ব্যাপারটি এখনো প্রমাণিত নয় বা হাইপোথিসিস)
অটিজম এ কী কী সমস্যা দেখা যায়ঃ

- প্রথমের দিকে বাচ্চাকে স্বাভাবিক বাচ্চার মত মনে হবে না, বাচ্চা সাধারনত অন্য রকম আচরনের হবে যেমন অত্যধিক দুষ্ট বা অত্যধিক শান্ত হবে।
- বাচ্চা যে বয়সে যা করার কথা তা করবে না, হয় অত্যধিক এডভান্স বা অত্যধিক বোকা হবে
বাচ্চা সবার সাথে সামাজিক যোগাযোগ করতে পারবে না যেমন কাউকে সম্বোধন করতে পারবে না চাচাকে চাচা বলা বা মামাকে মামা বলা, কাউকে টাটা দেয়া বা কাউকে দেখলে হাসা বা ভয় পাওয়া ইত্যাদি অনুপস্থিত। তবে সব শিশু বাবা মাকে ডাকে। - একা থাকার প্রবণতা থাকবে।
- কথা ঠিক মত বলবে না বা কিছুটা সমস্যা থাকবে।
- একই কাজ বার বার করবে, বা এক অভ্যাস বার বার চলমান থাকবে যেমন বার বার নাকে হাত দেয়া, বার বার পা তুলে দেয়া , হাত নাড়াচাড়া করা ইত্যাদি।
- নিজেকে আঘাত করা যেমন মাথা দেয়ালের সাথে বারি দেয়া।
অন্য কেউ কিছু দেখায় দিলে তা দেখবে না, যেমন আংগুল দিয়ে চা্দ দেখালে সে দেখবে না, বা দূরের কিছু দেখালে সে ওটা দেখবেই না - কেউ কেউ অত্যধিক বুদ্ধিমান হয় যেমন খুব ভালো আর্ট করে, কেউ ভালো কম্পিটার চালাতে পারে, কেউ ভালো ইংরেজি বলে, কেউ ভালো অংক করে ইত্যাদি ইত্যাদি।
- আবার কেউ অনেক বোকা সোকাও হয়
- সব সময় হাসে বা কাদে
- বাচ্চদের সাথে খেলার সময় অন্য বাচ্চাদের সাথে মারামারি করে যাকে ইংরেজিতে বুলিং (bullying)বলে।
- অনেকে পায়খানা প্রসাব করে হাত দিয়ে ধরবে। সাধারনত সব বাচ্চাই এমন করে তবে এরা শেখালেও বন্ধ করবে না।
- ধংসাত্বক টাইপের হয় কোন কোন বাচ্চা যেমন সব সময় জিনিস পত্ত্র ভাংচুর করে।
- এই ধরনের বাচ্চাদের সাধারনত কোন ভয় থাকে না, যেমন কুকুর বা বিড়াল দেখলে তার গলা ধরে, আগুন, পানি কোন ভয় নাই।
- নিজেই নিজের হাত কাটতে পারে।
- স্বাভাবিক সামজিকতা বুঝতে না পারা, যেমন অনের অটিস্টিক ব্যাক্তি আমাদের মাঝে আছে তারা যেকোন জায়গায় যে কোন কথা বলে ফেলে,অনেকে তাতে বিব্রত হয়,এরকম অত্যধিক মাত্ত্রায় হলে বুঝতে হবে এটাও এক ধরনের অটিজম, তবে স্পেশালিস্ট ডাক্তার এর মতামত অবশ্যই প্রয়োজন।
- অটিস্টিক বাচ্চাদের কোন শারীরিক সমস্যা থাকবে না যেমন সেরিব্রাল পলসি বাচ্চাতে থাকে
- অটিস্টিক বাচ্চা কল্পনামূলক খেলা খেলতে পারবে না যেমন খুটিমশলা খেলা, এমনি এমনি বর-বউ খেলা আরো ইত্যাদিg ইত্যাদি।
তবে মূল তিনটি আচরণ থাকবেই আর তা হলোঃ
- চোখে চোখে তাকবে না, যেমন আপনার বা অন্য কারো সাথে কথা বলার সময় চোখে চোখে মিলবে না।(Loss of eye contact)
- সামাজিক বন্ধন বুঝবে না (Loss of Social communication)
- একই কাজ বার বার করবে।(Repetitive Behaviour)
(এই সমস্যাগুলো সবার মাঝে তীব্র মাত্ত্রায় নাও থাকতে পারে, কারো ভিতরে কম বেশি হতে পারে)
পরিসংখ্যানঃ
২০১৫ সালের একটা হিসাবে দেখা গেছে সারা বিশ্বে ২৫ মিলিয়ন বাচ্চা বা ব্যাক্তি অটিজমে আক্রান্ত।উন্নত দেশে ২০১৭ সালের এক গণনায় দেখা যায় ১.৫ শতাংশ বাচ্চা অটিস্টিক।মেয়ে বাচ্চার থেকে ছেলে বাচ্চা ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি আক্তান্ত হয়।
কিভাবে বুঝা যাবে আমার বাচ্চা আক্রান্ত হচ্ছেঃ
সাধারণত আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে অটিজমের সমস্যাগুলো বোঝা যায়।আমরা লক্ষণগুলো মিলালে কিছুটা বুঝতে পারবো তবে অবশ্যই একজন স্পেশালিস্ট ডাক্তার না বলা পর্যন্ত ফাইনালি ডায়াগনোসিস করা যাবে না।অনেক সময় নিউরোমেডিন স্পেশালিস্টরা অনেক প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করে থাকে , অনেক সময় অন্য রোগ থেকে আলাদা করার জন্য এগুলোর প্রয়োজন আছে।সিটি স্ক্যান বা এম আর আইও করা হয় অনেক সময়।
প্রতিরোধঃ
- বংশে থাকলে আপনার বাচ্চার হবার সম্ভাব্যতা আছে
- মা যখন পেটে বাচ্চা ধরেন তখন কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যেমন নিচের গুলো স্মরণ রাখতে হবে।
- প্রেগনেন্সির সময় রুবেলাসহ অন্যানা টিকা মা’কে দেয়া
- মা যেন অপুষ্টিতে না ভোগে
- বাল্য বিবাহ কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়
- পরিকল্পিত গর্ভধারণ করতে হবে, অর্থাৎ বাচ্চা নেব কি নেব না এমন দিধাদ্বন্দে থেকে বাচ্চা নষ্ট করার চেষ্টা করা যাবে না। অনেকে বাচ্চা পেটে আসার পরও কনট্রাসেপ্টিপ পিল বা অন্য ব্যবস্থা নেয়, এমন করলে পেটের বাচ্চার উপর একটা স্ট্রেস পড়ে এবং বাচ্চা সিপি বা অন্যান্য প্রতিবন্ধিতার স্বীকার হয়।
- আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বিয়ে যতটা পরিহার করা যায় ততই ভালো।যেমন মামাতো ফুফাতো ভাই বোন, চাচাতো ভাই বোন ইত্যাদি ইত্যাদি।
- ফরমালিন মুক্ত খাবার কিভাবে খাওয়া যায় সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
- পরিবেশগত দূষন যত এড়িয়ে চলা যায়।
- ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে হবে।
প্রেগনেন্সীতে ড্রাগ এবিউজ
মেডিকেল চিকিতসাঃ
মেডিসিন স্পেশিস্টরা সাধারনত কিছু ড্রাগ দিয়ে থাকে যেমন এন্টিকনভালসেন্ট, সাইকোএক্টিভ , এন্টিডিপ্রেস্নড ড্রাগ ইত্যাদি।
ফিজিওথেরাপীঃ
এই সমস্যায় সবচেয়ে ভালো চিকিতসা হলো ফিজিওথেরাপী ।যদি অনেক দ্রুত ডায়াগ্নোসিস করা যায় এবং দ্রুত ফিজিওথেরাপী শুরু করা যায় তাহলে অনেকটাই এ সমস্যা কমে আসে।আমরা কি ধরনের ফিজিওথেরাপী নেব তা একটু দেখে নেই
- বিহেবিয়ার লার্নিং থেরাপী যেমন কিভাবে কারো সাথে প্রথম ইন্ট্রডাকশন করা হয় এসব বিভিন্ন খেলার ছলে বাচ্চাকে শিখানো হয়, বাইরে কাউকে দেখলে কি বলতে হয় এগুলো শিখানো হয়
- কমিউনিকেশন ট্রেনিং
- প্লেয়িং থেরাপী যেমন বাচ্চার সাথে মাঝে মাঝে খেলতে হবে এবং খেলার মধ্যে অনেক কিছু শিখাতে হবে
- ড্রয়িং বা আকা।
- ইন্টেলেকচুয়াল গেম যেমন পাজল ক্রিয়েট, অনেক গুলো বর্ণের পর আবার কোনটা হয় সেটা ট্রেনিং করা
- রিডিং এন্ড রাইটিং ট্রেনিং
- মাদার কাউন্সেলিং, মা-বাবা দেরও কিছু কাজ বা ট্রেনিং শিখে দেয়া যাতে তারাও বাসায় করতে পারে
- অটিজম কর্ণার বা বিশেশায়িত ফিজিওথেরাপী সেন্টার।
- স্পেশাল এডুকেশন
- গ্রুপ থেরাপি যেমন অনেক গুলো বাচ্চাকে একসাথে নিয়ে কোন একটা লার্নিং প্রসেস এ এগিয়ে যাওয়া।
লার্নিং ইন্ডেপেন্ডেন্সি যেমন বাচ্চাকে প্রথম প্রথম কোন কাজ করে দেয়া হয় এর পর আস্তে আস্থে তাকেই কাজটি করতে দিতে হবে।ব্যাক্তিগত কাজ গুলি (ADL) যাতে সে একাই করতে পারে সেরকম অভ্যাস করা।নিজের প্যান্ট নিজেই পড়া, নিজের শার্ট নিজে পড়া, নিজে টয়লেটিং করা ইত্যাদি
অটিজমের নামকরণ বা ইতিহাসঃ
জার্মানির ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি হস্পিটাল এ ১৯৩৮ সালে বাচ্চাদের মনস্তত্ত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হ্যান্স অ্যাস্পারজার সর্বপ্রথম অটিস্টিক সাইকোপ্যাথস শব্দ ব্যবহার করেন।এজন্য অটিজমের একটা প্রকারভেল আছে এজপারজার সিন্ড্রোম। ১৯৪৩ সালে জন হপকিন্স হাসপাতালের লিও ক্যানার সর্বপ্রথম আধুনিক অটিজম শব্দের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।ডোনাল্ড ট্রিপ্লেট সর্বপ্রথম ব্যাক্তি যাকে অটিস্টিক হিসাবে ডায়াগ্নোসড করেন লিও ক্যানার। বাচ্চাদের সিজোফ্রেনিয়া অনেক সময় অটিজম এর সাথে মিলে ভুল হয়ে যায়।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটঃ
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৯৯৯ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয় যা পরে জেপিইউএফ-এ পরিণত হয়। অটিজমসহ এনডিডি (নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার) আক্রান্তদের চিকিৎসাসহ যাবতীয় অধিকারের সুরক্ষা আইনের আওতায় আনতে ২০১৩ সালে ‘ডিজএবিলিটি ওয়েলফেয়ার এ্যাক্ট’ ও ‘দ্য ন্যাশনাল নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার প্রটেকশন ট্রাস্ট এ্যাক্ট’ করা হয়। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক, কাউন্সিলিং ও অন্যান্য সেবা এবং সহায়ক উপকরণ দিয়ে থাকে প্রতিবন্ধি সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র।প্রত্যেক জেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে একটি করে অটিজম কর্ণার রয়েছে সেখানে সকল অটিস্টিক বাচ্চা বিনামূল্যে ফিজিওথেরাপী সেবা পায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিজম বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করে দেশ বিদেশে নন্দিত হয়েছেন।প্রত্যেক জেলার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের কন্সাল্ট্যান্ট (ফিজিওথেরাপি) এর তত্ত্বাবধানে দক্ষ ফিজিওথেরাপি সহকারীর মাধ্যমে অটিজম বাচ্চাদের সুস্থ করার ব্যবস্থা চলছে।
সূত্রঃ ইন্টারনেট
সম্পাদনায়ঃ
ডাঃমোঃমোস্তাফিজুর রহমান
বিপিটি(নিটোর/পংগু হাস্পাতাল)কনসালট্যান্ট (ফিজিওথেরাপী)