বর্তমানে ফিজিওথেরাপির ব্যপক জনপ্রিয়তা’র কারনে সব ধরনের ফিজিশিয়ানরাই ফিজিওথেরাপি রেফার্ড করে এবং রোগিরা নিজেরাও অনেকে সচেতনতার কারনে থেরাপি নিতে আসে। ফিজিওথেরাপিস্ট এর শরণাপন্ন হয়েই রোগিরা জানতে চায় এই থেরাপিতে কি কোন ক্ষতি হয় যেমন চুল কি পড়ে যায়? আমি তখন জানাই না না এই থেরপি সেই থেরাপি নয় এটি হচ্ছে ফিজিওথেরাপি। তো ফিজিওথেরপির মধ্যে ইলেক্ট্রথেরাপি ই হচ্ছে সব থেকে বহুল ব্যবহৃত থেরাপি এবং আসুন জেনে নেয়া যাক এই ইলেক্ট্রথেরাপির আদ্যপান্ত।

ইলেক্ট্রথেরাপীঃ

ইলেক্ট্রথেরাপী হচ্ছে ইলেক্ট্রিক্যাল ইকুইপমেন্টের মাধ্যমে যে ফিজিওথেরপি সেবা প্রদান করা হয় তাই ইলেক্ট্রথেরাপি যেখানে ইলেক্ট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট গুলো মানবদেহের বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন গবেষণা’র মাধ্যমে ফিক্সড করা হয়েছে বা প্রস্তুত করা হয়েছে।পদার্থ বিজ্ঞান এবং মাইক্র ইলেক্ট্রনিক্স এর সাথে অঙ্গাঅংগিক ভাবে জড়িত এই চিকিতসা ব্যবস্থাটি যা একজন সঠিক ডিগ্রী প্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্ট বা ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ছাড়া কখনোই মানব শরীরে বা রোগীর ক্ষেত্রে এপ্লাই করা যাবে না।

Irr light 

প্রয়োগঃ

ইলেক্ট্রোড চামড়ার উপরে দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর মধ্যে স্বল্প বা উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির বিদ্যুত প্রবাহের মাধ্যমে এই থেরাপি দেয়া হয়। এভাবে বিদ্যুত প্রবাহ নার্ভ বা মাসল কে উত্তেজিত করে এবং ব্যথা কমায় বা বিভিন্ন ধরনের ফিজিওলজিক্যাল প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।

প্রকারভেদঃ

ইলেক্ট্রথেরাপির বিভিন্ন ধরন বা প্রকার আছে এবং তা কারেন্টের প্রবাহ, ফ্রিকোয়েন্সি,ভোল্টেজ ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।মোটা দাগে থেরাপিউটিক কারেন্ট কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়

লো ফ্রিকোয়েন্সি কারেন্ট

মিডিয়াম ফ্রিকোয়েন্সি কারেন্ট

হাই ফ্রিকোয়েন্সি কারেন্ট

লো ফ্রিকোয়েন্সি কারেন্ট সাধারনত ০-১০০ হার্জ এর মধ্যে হয়, হার্জ হচ্ছে ফ্রিকোয়েন্সি পরিমাপের একক।এই লেভেলে এর কারেন্ট থেরাপি’র বিদ্যুত হলো ডাইরেক্ট কারেন্ট, ইন্টারআপটেড কারেন্ট,ট্রান্সকিউটেনিয়াস ইলেক্ট্রিক্যাল নার্ভ ইস্টিমুলেশন ইত্যাদি

মিডিয়াম ফ্রিকোয়েন্সির কারেন্ট সাধারনত ১০০০-১০০০০ হার্জ এর হয় এবং এই লেভেলের কারেন্ট হলো ইন্টারফারেন্সিয়াল কারেন্ট। মানবদেহের একটু গভীরে যেসব মাসল আছে বা অন্য অর্গান আছে তাদের চিকিতসায় এই ফ্রিকোয়েন্সির কারেন্ট ব্যবহার হয়।

হাই ফ্রিকোয়েন্সি কারেন্ট হলো ১০০০০ এর উপরের হার্জ এর কারেন্ট বা বিদ্যুত। অনেক গভীরের মাসলে বা অন্যান্য অর্গানের সমস্যার চিকিতসায় এই লেভেলে এর ইলেক্ট্রথেরাপি ব্যবহার হয় যেমন শর্ট ওয়েভ ডায়াথার্মি, মিডিয়াম ওয়েভ ডায়াথার্মি, আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, শক ওয়েভ থেরাপি, লেজার ইত্যাদি

যেসব ডিভাইস আমরা ব্যবহার করে থাকিঃ

  • আল্ট্রাসাউন্ড থেরপি বা ইউ এস টি
  • আই আর আর বা ইনফ্রা রেড রেডিয়েশন লাইট
  • টেনস বা ট্রান্সকিউটেনিয়াস নার্ভ স্টিমুলেশন
  • মাসল স্টিমুলেশন
  • আই এফ টি
  • লেজার
  • শর্ট ওয়েভ ডায়াথার্মি
  • শক ওয়েভ থেরাপি
  • মাইক্রো ওয়েভ ডায়াথার্মি
  • ওয়াক্স বাথ
  • ব্রেন স্টিমুলেটর
  • অটো ট্রাকশন

ইত্যাদি

যেসব উপকার হয়ঃ

  • মাসেল বা নার্ভের ইনফ্লামেশন কমায়
  • ব্যথা কমায়
  • রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে
  • হিলিং প্রসেস কে ত্বরান্বিত করে
  • মাসেল এর স্ট্রেন্থ রাড়ায়
  • টিস্য রিপেয়ার করে এবং এদের রিজেনারেশন করে
  • নার্ভ এর ব্যথা কমায়
  • নার্ভ এর কন্ডাকশন বৃদ্ধি করে
  • মাসেল এর টেনশন কমায়
  • মাসেল কে রিলাক্স করে
  • জয়েন্ট এর রেঞ্জ বৃদ্ধি করে
  • ব্রেণের কার্যকারিতা বাড়ায়
  • মাইক্রোমেসেজ করে
  • সার্জারি এবং ড্রাগস এর প্রয়োজনীয়তা কমায়

যেসব কন্ডিশনে সাধারনত ইলেক্ট্রথেরাপি দেয়া হয়ঃ

 

  • জয়েন্ট পেইন
  • মাসল পেইন
  • নার্ভ পেইন
  • ক্রোনিক ইনফ্লামেশন
  • অস্টিওআর্থাইটিস
  • রিউমাটয়েড আর্থাইটিস
  • স্ট্রোক
  • স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি
  • সকল ধরনের নার্ভ কন্ডিশন
  • মেনিনজাইটিস
  • পালমোনারি ডিজিজ কন্ডিশন

ইত্যাদি

যেসব কন্ডিশনে ইলেক্ট্রথেরাপি দেয়া যায় না ঃ

 

  • একিউট ইনফেকশন
  • ওপেন ইনজুরি
  • ক্যান্সার
  • টিউমার 
  • পেসমেকার ফিট করা এরিয়ায়
  • স্কিন ইনফেকশন
  • প্রেগনেন্সি
  • চোখ,মুখ বা ইন্টারনাল অর্গান
  • হার্টের রিং বসানো অবস্থায় কিছু কিছু ইলেক্ট্রথেরাপি নিষেধ
  • ইমপ্লান্ট বসানো হাড়ে
  • খিচুনি থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে

যেসব রিস্ক দেখা দিতে পারে এই থেরাপি দেয়ার সময়ঃ

  • স্কিন বার্ণ
  • নার্ভ ডেমেজ
  • মাসল এর গঠন গত পরিবর্তন
  • কার্ডিয়াক কিছু প্রবলেম হতে পারে
  • এলার্জিক রিয়েকশন 
  • তবে এগুলো সাধারনত সঠিক ভাবে এপ্লাই না করতে পারলে হতে পারে।

ইলেক্ট্রথেরপির শুরুর দিকটা যেমন ছিলঃ

  • ১৭৪৩ সালে জোহান গতলব ক্রগার সর্বপ্রথম ইলেক্ট্রথেরপির ব্যবহার করেন
  • ১৭৪৭ সালে জন ওয়েজলি ইলেক্ট্রথেরপিকে সব জায়গায় ব্যবহার করা শুরু করেন তবে মূল স্রোতধারার চিকিতসক রা তা অনুতসাহিত করে
  • জিওভানি আলদেনি ১৮২৩ সালের দিকে স্টেটিক ইলেক্ট্রিসিটির ব্যবহার করে
  • ১৯৩৮ সালে ইটালিতে ইলেক্ট্র কনভালসিভ থেরাপির আবিষ্কার হয়।
  • ব্রিটিশ মেন্টাল হস্পিটালে ১৯৩৯ সালের দিকে খিচুনির পরীক্ষায় ইলেক্ট্র কনভালসিভ প্রক্রীয়া শুরু হয়।
  • ১৯৬০ সালের আমেরিকায় স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে ফাংশনাল ইলেক্ট্রিক্যাল স্টিমুলেশন এর ব্যবহার শুরু হয়।
  • পউল এম জোল এম ডি কে আধুনিক ইলেক্ট্রথেরপির জনক বলা হয়।

 

একজন রোগীর ভালো হবার গল্পঃ

আবু সায়েম (ছদ্ম নাম) চেম্বারে এসেই বলতেছে আমার হাড়ের মাঝখানে ডিস্কে চাপ পড়ে গেছে , ডাক্তার বলেছে নার্ভের উপর প্রেশার পড়ছে। আমি সাথে সাথে বললাম আপনার সমস্যার কথা বলেন ,ভিতরে কি হয়েছে এটা আমি শুনতে চাই নি, আমি জানতে চাচ্ছি আপনার কি কি প্রবলেম হয়। রোগিরা ইদানিং এমন হইছে যে সামনে বসেই কোন ডাক্তার কি বলছে এগুলা বলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় ,তারা আসলে কি কি সমস্যা সেগুলো বলে না।এরপর রোগী বললো আমার পায়ের দিকে অনুভূতি কম বা ঠোসা ঠোসা লাগে,সুই হানার মত অনুভূত হয়,জ্বলে বা জ্বালা পোড়া করে।আমি বললাম পূর্বে কখনো কোমড় ব্যথা ছিল কি? রোগী বললো হ্যা কিছু ব্যথা ছিল তবে এখন আর কোমড়ে ব্যথা নাই।আমি বললাম এই পায়ের ব্যথা আপনার কোমড় থেকেই আসতেছে এবং পূর্বের ব্যথা ভালো ভাবে চিকিতসা হয় নি বলে এই ব্যথা আপনার রেডিয়েট করে পায়ের নীচের দিকে চলে গেছে।ব্যথা যদি কোমড়ে না থেকে পায়ের দিকে চলে যায় তবে সমস্যাটা বেশি।

 

ভালোভারে রোগীকে এসেসমেন্ট করে প্রেসক্রিপশন করলাম,আমি সাধারনত ক্রনিক সায়াটিকার ক্ষেত্রে প্রথমে টেনস এপ্লাই করি সাথে সাথে এক্টিভিটি অর ডেইলি লাইফ চেঞ্জ করে দিলাম।চলাফেরা করার সময় কোমড়ের বেল্ট ব্যবহার করার জন্য ভালোভাবে বলে দিলাম। বিছানা ,বসার স্টাইল, দাড়ানোর স্টাইল এবং কতক্ষন দাড়ায় থাকবে, কতক্ষন বসে থাকবে ,বসার ক্ষেত্রে চেয়ার কেমন হবে, টয়লেটের ক্ষেত্রে কমোড অথবা কমোড চেয়ার ইত্যাদি বলে দিলাম। এভাবে ০৭ থেকে ১২ দিন যাওয়ার পর একটা ফলোআপ দিলাম, সায়েম সাহেব বললো কিছুটা পায়ের দিকে ভালো মনে হয় কিন্তু পুরোপুরি অস্বস্তি ভাব এখনো যায় নি।আমি বললাম আপাতত কমা শুরু হইছে এখন আরো কয়েকদিন পর দেখি কি হয়।আরো ৭ দিন পর দেখলাম রোগীর উন্নতি ৫০ ভাগের কাছাকাছি, নিয়ম কানুন গুলো ফলোয়াপ দিলাম , শুনলাম সব মানতেছেন কিনা ঠিকমত। সায়েম সাহে্ব বললো মানতেছি তবে মাঝে মাঝে নিয়মে সমস্যা হয়। অনেক সময় মানতে পারি না ।

ঠিক ২০ দিনের মাথায় আরেকটা ফলোয়াপে দেখলাম সুবিধাজনক পরিবর্তন হয় নি । এবার টেনন্স এর পাশাপাশি লাম্বার ট্রাকশন শুরু করলাম ।রোগিকে প্রথম ট্রাকশন দিলে অনেক সময় একটু কোমড়ের ব্যথা বেড়ে যায় তবে ট্রাকশন চালিয়ে গেলে সেটা কমে আসে। ৩০ দিনের মাথায় ফলোয়াপে দেখলাম ৭০ ভাগ সমস্যা সব কমে আসছে । এবার উনার কোমড়ের মাসেল পাওয়ার বাড়ানোর জন্য কিছু মাসেল স্ট্রনদেনিং এক্সারসাইজ দিলাম এবং এক্সারসাইজের গ্রেড এবং লেভেল গুলো ভালোভাবে রোগীকে বুঝালাম এবং প্রগ্রেসিভ লি আগায় নিতে বললাম। এভাবে আরো ১০ দিন পর সায়েম সাহেব মোটামুটি ৮০ ভাগ ঠিক হয়ে গেছে।পায়ের দিকে জালা পোড়া একেবারে নাই, মাসেল টাইটনেস ভাব সেটাও কমে গেছে । তবে রোগীকে থেরাপী দেয়ার ফ্রিকোয়েন্সি কমায় দিলাম সপ্তাহে তিন দিন আসতে বললাম। এভাবে আরো ১৫ দিন কন্টিনিউ করতে বললাম। এরপর সপ্তাহে দু দিন করে আসতে বললাম এবং ধীরে ধীরে চিকিতসা শেষের দিকে নেয়ার পরামর্শ দিলাম। তবে সায়েম সাহেবকে নিয়ম কানুন এবং এক্সারসাইজ গুলো কন্টিনিউ রাখতে বললাম। ১৫ দিন পর পর আমাকে এসব রিপোর্ট করতে বললাম।শেষের দিকে একটা পরামর্শ দিলাম আর তা হলো এই সব মেকানিকাল পেইন বা ব্যথা পুরোপুরি যাবে না কিছু না কিছু থেকে যাবে তবে নিয়ম কানুন ঠিক মত মানতে পারলে আপনি মোটামুটি ভালো থাকবেন। সায়েম সাহেব সব কিছু বুঝে নিল এবং বললো আলহামদুলিল্লাহ এখন অনেক ভালো আছি।

 

Scroll to Top