হাইড্রথেরাপি
জানুয়ারি ২৪, ২০২৫ ইং
হাইড্রথেরাপি
পানির মাধ্যমে যে থেরাপি কোণ রোগীর রোগ উপশমের জন্য দেয়া হয় তাকে হাইড্রোথেরাপি বলে। হাইড্রোথেরাপি’র বিভিন্ন নাম রয়েছে যেমন পুল থেরাপি, একুয়াটিকে থেরাপি, পানির থেরাপি, ব্যালনিওথেরাপি ইত্যাদি।

ব্যবহারঃ
হাইড্রথেরাপি সবচেয়ে বহুল ব্যবহার হয়ে থাকে গরম পানির মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার জায়গায় সেক দেয়া। আমদের দেশের সব মেডিকেল প্রাক্টিশনার রাই এই পদ্ধতিটি বেশি এডভাইস/পরামর্শ করে থাকে । গরম পানি কোণ জায়গায় ঢেলে দেয়াও হাইড্রথেরাপি’র একটি ব্যবহার।এছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে তা নিচে দেয়া যাকঃ
- হাইড্রকোল্যাটার প্যাকঃ এই যন্ত্রে গরম পানির মাধ্যমে একটি প্যাডকে গরম করা হয়। এরপর সেই প্যাডকে বিভন্ন জয়েন্ট বা শরীরের যেখানে চিকিতসক যেভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন সেভাবে ব্যবহার করা হয়।
- স্টিম বাথঃ এটিল একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি, এই পদ্ধতিটি বেশি ব্যবহার হয় জিমে , শরীরে অতিরিক্ত মেদ ঝড়ে ফেলার জন্য। সাথে সাথে এই পদ্ধতিতে শরীরের বিভিন্ন রোগের উপশমও হয়ে থাকে।
- পানিতে সাতার কাটাঃ পানিকে গরম না করেও সাধারন্ত পানিতে নেমে পানির নীচে হাটা, বিভন্ন ব্যায়াম করা বা সাধারন সাতার দেয়াও হাইড্রোথেরাপি’র মধ্যে পড়ে।
- আন্ডারওয়াটার এক্সারসাইজঃ পানিতে নেমে বা পুলে নেমে পানির নীচে ভিনিন্ন থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ করা হাইড্রোথেরাপির বড় অংশ। এখানে পানির বুয়েন্সিকে কাজে লাগানো হয়।
- স্টিজ বাথ/হিপ বাথঃ এটি এমন এক ধরনের বাথটাব যেখানে বসলে হিপ বা কোমড় পর্যন্ত পানি আসে । এটি সাধারনত হিপ বা লোয়হার লিম্বের বিভন্ন ব্যথা বা পাইলস এর সমস্যায় বহুল ব্যবহার হয়।
হাইড্রথেরাপিতে পানির যে গুণাবলীগুলো চিকিতসকগ্ণ ব্যবহার করে থাকেন সেগুল হলো
- পানির ভর
- পানির ওজন
- ঘন্তত্ব
- আপেক্ষিক ঘন্ত্ব
- সান্দ্রতা
- পানির চাপ
- উর্ধ্মুখী চাপ
- উর্ধ্মুখী বল
- বিফ্লেকশন
- রিফ্রাকশন

হাইড্রোথেরাপি’র মূল লক্ষ্যগুলো হলোঃ
- মাসল বিলাক্স করা
- মাংসের শক্তি বৃদ্ধি করা
- জয়েন্টের মুভমেন্ট বাড়ানো
- ব্যথা কমানো
- মাসেলের ব্যালান্স বা লিম্বের ব্যালান্স বা কো-অর্ডিনেশন ঠিক রাখা
- রক্ত চলাচল ঠিক রাখা
থেরাপিউটিক ইফেক্ট বা উপকারিতাঃ
- মাংসের ব্যথা কমানো এবং মাংসের খিচুনি বা টাইট ভাব কমানো
- পুরো বডির রিলাক্স করা হয়
- জয়েন্টের মুজভমেন্ট বৃদ্ধি বা স্বাভাবিক রাখা হয়।
- প্যারালাইলজড মাসেলকে পুনর্বাসন করা বা নতুন করে স্বাভাবিকতায় নিয়ে আসা
- দুর্বল মাসেল্কে শক্তিশালি কর , সাথে সাথে ব্যালান্স এবং সহ্য ক্ষমতা বাড়ানো
- গেইট বা হাটার প্রাকটিসকে সাবলীল বা সঠিক করা
- শরীরে ব্যালান্স ঠিক করা
- রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখা
- মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখা
- নার্ভাস সিস্টেমকে সঠিক রাখা
- পা ফোলা কমায়
- চর্ম রোগের উপকারিতা
যেসব রোগের ক্ষেত্রে হাইড্রোথেরাপি সাধারনত ব্যবহার করা যায় না বা করলেও অনেক সত্ররকতা অবলম্বন কর লাগে তা হলোঃ
- মারাত্বক আকারে হার্টের সমস্যা
- বেশ ভালো ফুসফুসের সমস্যা থাকলে
- পুরোপুরি ব্যালান্স না থাকলে
- খুব বেসি খিচুনী থাকলে
- ঠান্ডাজনিতে সমস্যা থাকলে
- গরম পানির প্রতি হাইপারসেন্সিটিভিটি
- ক্লোরিন এলার্জি
- ইনফেক্সাস রোগ বা ছোয়াচে রোগ থাকলে
- পুরোপুরি প্রস্রাব/পায়খানা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে
- ব’ড় ধরনের ক্ষত
- হাইড্রোফোবিয়া

যেসব ক্ষেত্রে হাইড্রোথেরাপি উপকারিঃ
- কোমড় ব্যথা
- যেকোন ধরনের মাসকুলোস্কেলেটাল ব্যথা
- স্পন্ডোলাইটিস
- আর্থ্রাইটিস
- সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস
- জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
- স্ট্রোক পরবর্তী ইমব্যালান্সড এর ক্ষেত্রে
- যে কোন রোগে মাসল পাওয়ার বাড়ানো লাগবে সেখানে
- পাকিনসনিজম
- ফাইব্রোমায়েলজিয়া
- সিপি বাচ্চা
- মাল্টিপল স্কেলেরোসিস
- বার্ন
- প্রেগন্যান্সি
- অবেসিটি
- নিউরোপ্যাথি
হাইড্রথেরাপি/অ্যাকুয়াটিক থেরাপি’র সাথে স্পা থেরাপি কি একই?
স্পা এবং হাইড্রথেরাপি একই মনে হলেও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে । স্পা থেরাপিতে পানির ক্যামিক্যাল গুণাবলীকে ব্যবহার করা হয় , যেখানে একুয়াটিক থেরাপী বা হাইড্রথেরাপিতে পানিকে ব্যবহার করে বিভন্ন এক্সারসাইজের মাধ্যমে সেখান থেকে উপকারিতে নেয়া হয়।

হাইড্রথেরাপি’র ইতিহাসঃ
প্রাচীন মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকে হাইড্রথেরপির ব্যবহার চলে আসছে। মিশরীয়্রা পানির সাথে বিভন্ন তেল, ফুল ইত্যাদি ব্যবহার করে গোসল করত। রোমান সাম্রাজ্যে বড় পুকুরে একই সাথে গোসল করার ইতিহাস দেখা যায়। বিখ্যাত দার্শনিক হিপোক্রেটাস বিভিন্ন সমস্যায় গর ম্পানি ব্যবহারের প্রামর্শ দিতেন। চীন এবং জাপানে বড় বড় প্রাকৃতিক গরম পানির পুকুর থাকত এবং সেখানে সবাই বিভিন্ন সমস্যায় গরম পানিকে ব্যবহার করত।
১৭০০ – ১৮১০ সালঃ
স্যার জন ফ্লোয়ার এবং ফিজিশিয়ান লিচফিল্ড ঠান্ডা পানির অনেক গূণাবলী বর্ণনা করে একটি বই লিখেছিলেন এবং তার বইপত্র জার্মাণ ভাষায় রূপান্তরিত হয় ‘দ্য হিলিং ভার্চুজ অব কোল্ড ওয়াটার’ নামে। জ্বর এবং অন্যান্য অসুস্থতায় ঠান্ডা ও গরম পানির ব্য বহার নিয়ে ১৭৯৭ সালে জেমস কুরি’র আরেকটি পাবলিকেশন বের হয়। এই লিখাগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং সবাই পানির বিভিন্ন ব্যবহার সম্পর্কে জানে। ভিনসেন্ট পেইসনিটজ নামে একজন কৃষকপুত্র একবার তার বাড়ির পাশে একটি হরিণকে দেখে যে হরিণটি একটি ক্ষত নিয়ে পুকুরের পানিতে গোসল করছে। সে বেশ কয়েকদিন এটা ফলো করতে থাকে এবং একসময় দেখে যে হরিণটির পানিতে গোসলের মধ্যমে সেটি তার ক্ষতস্থান সারিয়ে তুলেছে। বেশকিছুদিন পর প্রেইসনিটজ তার নিজের বুকের হাড় ভেংগে ফেলে ঘোড়ার গাড়ির সাথে দূর্ঘটনা ঘটিয়ে। সচরাচর সে ফিজিশিয়ান এর শরণাপ্নন হয়। ডাক্তার/ফিজিশিয়ান তাকে বলে এই ভাংগা হাড় কখনোই ভাল হবার নয়। প্রিসনিটজ আশাহত হয় এবং সে নিজেই তার চিকিসসা শুরু করে পানিতে ভিজানো ব্যান্ডেজের মাধ্যমে এবং প্রচুর পরিমান পানি পানের মাধ্যমে। এভাবে বছর খানেক পরে তার হাড় এর জোড়া লেগে যায় । পরবর্তীতে সে বিভিন্ন অসুসস্থতায় অনেক মানুষের চিকিতসা শুরু করে হাইড্রথেরাপির মাধ্যমে। এভাবে ১৮২৬ সালের দিকে সে একটি হাইড্রথেরাপি ক্লিনিকে প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৮৪০ সালের দিকে তা অনেক সুনাম অর্জন করে।

সেবাস্টিয়ান নীপ নামে একজন জার্মান ব্যাক্তি প্রিসনিটজ এর ধারাবাহিকতা অনুসারে হাইড্রথেরাপি প্রাক্টিস করতে থাকেন তবে তিনি শারীরিক আঘাত এত পাশাপাশি মানসিক ট্রমা নিয়েও কাজ করেন।
১৮৪২ সালের দিকে ব্রিটেনে হাইড্রথেরাপি সম্পর্কে পরিচয় করায় দেন ক্যাপ্টেন আর টি ক্লারিজ নামের এক ব্যাক্তি। ব্রিটেনে আরো কিছু ফিজিশিয়ান হাইড্রথেরাপি প্রাকটিস করেন এবং তারা হচ্ছেন জেমস উইলসন, জেমস ম্যালবি গালি। গালি ১৮৪৬ সালে ‘দ্য ওয়াটার কিউওর ইন ক্রনিক ডিজিজ নামে একটি বই পাবলিস্ট করেন। মেল্ভার্ন এ তারা বিভিন্ন ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানকার বিভিন রোগীদের মধ্যে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিও ছিলেন যেমন চার্লস ডারউইন, চার্লস ডিকেন্স, থমাস কার্লি, ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল , লর্ড ট্যানিসন, স্যামুয়েল উইল্বারফোর্স।
ইতিহাসের আলোচনায় দেখা যায় ডেভিড উবকুহার্ট নামে একজন ব্যক্তি ইংল্যান্ডে ‘ভিক্টোরিয়ান টার্কিস বাথ’ নামে একটি গরম পানির হাইড্রথেরাপি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। এটি পরবর্তীতে পাবলিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
আমেরিকায় হাইড্রথেরাপি চিকিতসা প্রতিষ্ঠা করেন জোয়েল শো এবং রাসেল থ্যাচার ট্রল নামের দুজন ফিজিশিয়ান। জন হার্ভে কেলগ ১৮৬৬ সালে বেটল গ্রীক স্যানিটিরিয়ামে হাইড্রথেরাপি’র বিজ্ঞান ভিত্তিক ভিত্তি গঠন করেন। সেই সময়কার বিখ্যাত হাইড্রথেরাপি সেন্টার এর মধ্যে পরিচিতি পায় ‘ক্লিভল্যান্ড ওয়াটার কিউর’ যেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৪৮ সালে। আমেরিকার মধ্যে নর্থ আমেরিকায় সেই সময় প্রায় ২০০ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে যেগুলো পানির মাধ্যমে চিকিতসার প্রথা গড়ে তোলে।