আমার সম্পর্কে -
বি.পি.টি (পঙ্গু হাসপাতাল/নিটোর) ডি.ইউ
কনসালট্যান্ট (ফিজিওথেরাপী)
প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, গাইবান্ধা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
জনসাধারণের সেবা করার লক্ষে ২০১৪ সালে গাইবান্ধা শহরে প্রতিষ্ঠা করা হয় মোমেনা-নজরুল ফিজিওথেয়াপী ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের। সেই থেকে সঠিক কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে ফিজিওথেরাপী দিয়ে অসংখ্য মানুষের সেবা করে আসছি। …………….
আমি
জন্ম ১৯৮৬ বা ১৯৮৭ ঠিক মত নোট নেই, মা বলত অস্টআশির বড় বন্যার সময় আমার জন্ম, সে হিসেবে আমি হিসাব করে ঠিক করেছি ১৯৮৬ সালের কোন এক মাসের শুক্রবারের বিকেলে। স্থানটি গাইবান্ধা শহরের অদূরে কৃষি ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের ডর্মিটরির ঠিক পশ্চিম পার্শে। সেই সময় আমাদের পরিবার সেখানে একটা ভাড়া বাসায় থাকতো।

ঠিক কোন সালে কিন্ডার গার্ডেন স্কুলে যাওয়া শুরু হয় তারও নোট নেই তবে ১৯৯১ বা ১৯৯২ এর দিকে শহরের আহম্মদ উদ্দিন শাহ শিশু নিকেতন স্কুলে প্লে ক্লাস এ সম্ভবত। এভাবে চলতে থাকে শিশু শিক্ষা, প্রাইমারি ও হাই স্কুল এ ১৯৯১ থেকে ২০০২ পর্যন্ত। ২০০২ সালে এস এস সি পাশ করে শেষ আহম্মদ উদ্দিন শাহ শিশু নিকেতন স্কুলের শিক্ষা জীবন। দীর্ঘ একটি সময় পেরিয়ে যায় এই বিদ্যানিকেতনে, অনেক স্মৃতি এই স্কুলের ভবনের সব কোনায় কোনায়। কত বলা না বলা কথা আছে তার ইয়ত্তা নেই, সেই রমজান স্যারের ধমকানি, পেটের চামড়ায় চিমটি কাটা, লিয়াকত স্যারের কঠিন মুখাবয়ব , অশ্বিনী স্যারের ক্লাসের গল্প, মলি টিচারের কানমলা, আনিছ টিচারের(গণিত) ডাবল স্কেলের পিটুনি, মাজহারুল মান্নান স্যারের মূর্ধন্য ষ ; যাকে আমি সারাজীবন উচ্চারন করে আসতাম মধ্যেন্য ষ ইত্যাদি ইত্যাদি। একটানা এক স্কুলে এত দিন আসলে কিছুটা বিরল তবে মাঝখানে আমি কিন্তু এক মাসের জন্য জেলা সরকারি বালক স্কুলেও ভর্তি ছিলাম, কিন্তু রমজান স্যার এ চাপাচাপিতে বাবা মা আমাকে আবার আহম্মদ উদ্দিন স্কুলে নিয়ে আসে। সময়গুলো মনে হয় যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, কিভাবে যে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।

একটু বেশি বলা হয়ে গেল , এরপর মাধ্যমিকের পর ভর্তি হই গাইবান্ধা সরকারি কলেজে যেখানে দু বছর ইন্টারমেডিয়েট যে কত দ্রুত পাড় হয়ে গেল কিছুই বুঝলাম না। এখানকার স্মৃতি আরো চঞ্চলতায় ভরপুর যেখানে আমি ডুবে যাই বিভিন্ন বন্ধু মহলে তবে পড়াশোনাও চলছিল সেই তালে কিন্তু কলেজে ক্লাস খুব একটা করা হত না । প্রথম বর্ষের অনেক স্মৃতি আমাকে খুব নাড়া দেয় যেমন রউফ স্যারের ম্যাথ প্রাকটিক্যাল, জিতেন্দ্র স্যার এর বাংলা প্রাইভেট, বাংলা সাহিত্য পড়ানোর স্টাইল, বায়োলজি ও জুওলজির ডিসেকসন, কেমিস্ট্রির প্রাক্টিক্যাল রুমের হাইড্রজেন সালফাইড এর পচা গন্ধ , আহ কিনা সময় ছিল! বেশ নসটালজিক লাগতেছে। ২য় বর্ষের কোন ক্লাস রুমেই ছিল না আ্মাদের , শুধু প্রাইভেট আর প্রাইভেট , দিনে অন্তত পক্ষে তিন থেকে চারটা প্রাইভেট পড়া লাগতো। সবচেয় ইনজয় করেছিলাম ফিজিকসের দাদার প্রাইভেট, আহ কি যে সময় একটা গেছে অছাম (owesome) ! এভাবে ২০০৪ সালে পাশ করলাম ইন্টারমেডিয়েট।

এরপর শুরু হোল ভর্তি যুদ্ধ, এই পর্বের যে অভিজ্ঞতা তা এখানে বর্ণ্না করলে পাঠকের বিরক্তি চলে আসবে শুধু এটুকু বলি জীবন কী এবং কিভাবে মানুষের জীবন মোড় নেয় তা এখানেই আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই। অনেক অনেক পর্বের গল্প পেরিয়ে লেখক ভর্তি হলো নিটোর এর ফিজিওথেরাপি সাবজেক্টে ২০০৫ সালে । এর মধ্যে দু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার চেষ্টা করেও লাভ হলো না কারণ নিয়তি যে এই সাবজেক্ট এর উপরই লিখা। ২০০৫ সালে ভর্তির পর আমাদের নিটোর এর কোন হোস্টেল বা হল ছিল না তাই গতানুগতিক ভাবে শ্যামলী’র পি সি কালচারের এক মেসে উঠা হলো, যেখানে সবাই ছিল ঐ নিটোরের ফিজিও স্টডেন্ট। বন্ধু বান্ধবীদের মধ্যে বিভিন্ন জন বিভিন্ন খানে কেউ গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ বুয়েটে, কেউ মেডিকেলে আবার কেউ ঢাকার বাইরে। বাড়ি ছাড়া এই প্রথম আমার জীবন কাটা শুরু হলো, যে ছেলে বাড়ির বাইরেই কখনো একা খুব একটা বের হয় নি সে এখন একা একা ঢাকায় থাকে। এর আগে আমি কখনো ঢাকাতেও আসি নেই। গ্রাজুয়েশন লাইফ এই প্রথম আমার ঢাকা আসা। পরিবার ছাড়া আমি হয়ে গেলাম রেকলেস, কোন বাধাই আর আমাকে বাধতে পারলো না । বন্ধু বান্ধব্দের সাথে আড্ডা , ঘুরাফেরা, বিভিন্ন পরিবেশের সাথে মিশা সব যেন চলছে এক চলন্ত ট্রেনের মত। শাসন করার কেউ নেই, যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াচ্ছি, কি যে একটা অবস্থা ! পড়াশোনাও চলছে তবে ধীর গতিতে কারণ না পড়লেও কেউ কিছু বলার ছিল না । ঠিক এই লাইভে এসে আমি বুঝলাম যে গার্ডিয়ান ছাড়া জীবন কী !

১ম বর্ষের পরীক্ষা আসলো কিন্তু আমার প্রস্তুতি মোটেও নেই, তাই গড়পরতা যা হবার তাই হলো। খাইলাম দুই তিনটা সাবজেক্টে সাপ্লিমেন্টারি তবে হ্যা এনাটমি , ফিজিওলজী যেটা সবাই বলতো এই দুইটা সাবজেক্ট এ ফেল মানে জীবন শেষ, সেটা কিন্তু হই নি। ঘোড়াঘুরি যে কি পর্যায়ে আমি ঢাকায় করেছি তার কোন হিসাব নেই, এখনো ঢাকার কোন রাস্তার একটা পার্শ্ব ছবি দেখলেই আমি বলতে পারবো ঐ জায়গা কোথায়, এত পরিচিত আমার নিজ জেলা গাইবান্ধাও নয় ! এভাবে ২য়, তয় এবং চতুর্থ বর্ষ গেল প্রতি বছরই দু তিনটা সাবজেক্টে ফেল তো আছেই কিন্তু ফাইনাল ইয়ারে কোন ছাপ্লি ছিল না। ইন্টার্ণী করতে গিয়ে বাধলো আরেক ঝামেলা, যে ওয়ার্ডের সিএ দায়িত্বে থাকতো সে সকাল সকাল ডাকতো, কি যে একটা মুশকিলে পড়লাম ! নিটোরের প্লেসমেন্ট গুলো কিছুটা করলাম কিন্তু বাইরের ইন্সটিউটে খুব বেশি ভালোভাবে ইন্টার্ণী করা হলো না। বিভিন্ন ঝামেলা, চড়াই উতরাই পেরিয়ে পাশ করার কথা যে সালে সেই পাশ হলো দু তিন বছর পর অর্থাৎ চার বছরের গ্রাজুয়শন শেষ হলো পাচ কি ছয় বছরে ! তবে হ্যা ছাত্র জীবন থেকেই আমি বিভিন্ন সিনিয়র স্যার বা ডাক্টার দের সাথে চেম্বারে সহকারি হিসেবে থাকতাম তাই প্রাকটিকেল টা খুব ভালো আমার আয়ত্ত্বে ছিল। বিভিন্ন রোগী যারা আমার দেশের বাড়ি থেকে ঢাকায় আসতো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাদের আমি ডিল করতাম বা স্যারদের কাছে নিয়ে যেতাম, ঠিক এই বিষয়টা আমাকে বিভিন্ন ডিজিজ কন্ডিশন নিয়ে অনেক শিখিয়েছে। সাথে সাথে বইয়ের পাতার সাথে মিলিয়ে নিলে খুব ভালো হত কিন্তু ঐ কাজ টি আর হয়ে উঠে নাই।

পড়াশোনার পালা শেষের দিকে , ভাবলাম ফিজিওথেরাপির চাকুরির বাজার সরকারিতে নেই বললেই চলে , বেসরকারিতে খুব খাটাখাটুনি এবং ঢাকার বাইরে তাই সেগুলোও আর হয়ে উঠলো না। সিনিয়র স্যারদের সাথে চেম্বারে যাতায়াত করতাম তাই কিছু ইনকাম সবসময় থাকতো, টাকা নিয় খুব একটা চিন্তা করতে হতো না। ছাত্রজীবনেও খুব একটা টাকার অভাব ফিল করতাম না , যা খুশি তাই খাইতাম, যা খুশি তাই করতাম। আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া এই দিক থেকে আলহামদুলিল্লাহ। বন্ধুদের মধ্যে কিছু নাম না বলেলেই নয় আমার ডিপার্ট্মেন্টের মধ্যে সুমন, শাহীন এই দুই জন ছিল সবচেয় ক্লোজ, আর ডিপার্ট্মেন্টের বাইরে বখতিয়ার, নির্ঝর,শাকিল,আউয়াল,রিতু,আরো অনেকে। যাদের নাম বললাম এরা ছিল অত্যন্ত কাছের, যখন শ্যামলীতে থাকতাম তখন সুমন ,শাহীন,সুমন ভাই (বাবা),ভাগনে এরা ছিল সবসময়। আবার ডি এম সি’তে( সেই সময় আমাদের বেসিক সাবজেক্ট গুলো ডিএমসিতে হতো সপ্তাহে দুই দিন) যখন আমরা ক্লাস করতে যাইতাম তখন বুয়েটের বখতিয়ার, শাকিল, এদের সাথে ঘুরতাম। মাঝে মাঝে ওদের হলে থাকা হতো আর সারা রাত চলতো আড্ডা।
এভাবে আর কত দিন বাব মা এদিক থেকে চাপ দিত চাকুরী বাকরীর কি খবর জানতে চাইতো। এক পর্যায়ে ঠিক করলাম বি সি এস দিব, সবাই মিলে পড়াশোনা চালালাম, একসময় শ্যামলীর মেস ছেড়ে বখতিয়ার,রিতু,অন্যান্য মিলে আরেক মেসে উঠলাম। ৩৪ তম বি সি এস এর ভাইভা পর্যন্ত গিয়ে নন ক্যাডারে নাম আসলো কিন্তু যে চাকুরী দিল তা আর করা হলো না।

এদিকে প্রফেশনাল সাবজেক্টের চাকুরি পরীক্ষা দিলাম প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে ২০১৩ সালের দিকে, আল্লাহর রহমতে হয়েও গেল, জয়েন করলাম এবং পোস্টিংও পেলাম গাইবন্ধায়, প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র এ কনসালট্যান্ট (ফিজিওথেরাপী) হিসেবে । সমস্যা এক্টাই চাকুরিটা সরকারী প্রোগ্রামের ছিল (বর্তমানে স্থায়ী হয়েছে) । এবার আমার ঢাকা ছাড়ার পালা। শেষ পর্যন্ত আর ঢাকায় থাকা হলো না এবং ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মানূষের সাথে উঠা বসা হতে থাকে,সমাজসেবার প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকি প্রায় চার বছর। নীলফামারি জেলায় বদলিজনিত চাকুরি করি প্রায় তেরো মাস। জয়পুর হাটে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করি কিছু মাস ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সময়ের মধ্যে পারিবারিক জীবন শুরু হয়ে যায় এবং সাথে সাথে আমি এক ছেলে এক মেয়ের বাবা হই আলহামদুলিল্লাহ। ২০১৯ সালের দিকে আমি মাস্টার্স ইন ডিজএব্যালিটি ম্যানেজমেন্টে এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন এ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং সফলতার সাথে দু বছরে পোস্ট গ্রাজুয়েশন কম্পিলিট করি। কিছু গবেষণার কাজ এখনো চলমান আছে এবং সামনে আমি পি এইচ ডি তে ভর্তি হব ইনশাআল্লাহ।


















